বিশ্ব শাসনে নতুন কৌশল: ইরানে গণতন্ত্র নয়, পুতুল সরকার চান ট্রাম্প
আপডেট: ০৩ মার্চ ২০২৬ ১১:৩৩ পিএম
ইরানসহ বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির পেছনে কোনো বাস্তব কৌশল না থাকলেও, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি স্পষ্ট ধারা ক্রমেই প্রকাশ পাচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী নন, বরং তিনি চান তার নির্দেশ মান্যকারী পুতুল সরকার। ইরান থেকে ভেনেজুয়েলা, এমনকি কিউবাও এই কৌশলের আওতায় আসছে।
নিউইয়র্ক টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মনে করি ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ ছিল একটি নিখুঁত দৃশ্যপট।’ দেশটিতে দুইজন ছাড়া সবাই নিজের পদে বহাল রয়েছে বলে জানান তিনি। কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী শাসনের পতন হলেও এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীকে মার্কিন বাহিনী আটক করে নিয়ে আসলেও পুরো সরকার কাঠামো অক্ষত রাখা হয়েছে।
এরপর ভেনেজুয়েলার গণতান্ত্রিক বিরোধীদের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র কার্যত কিছুই করেনি। বরং ট্রাম্প প্রশাসন ডেলসি রোদ্রিগেজকে তেলসহ ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থে সহযোগিতার শর্তে গ্রহণযোগ্য মনে করছে বলে বিশ্লেষকদের দাবি।
ইরানের ক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রতীয়মান হতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিমান হামলার প্রাথমিক পর্যায়ে দেশটির দীর্ঘদিনের শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, তার স্ত্রী ও পরিবার এবং তার ঘনিষ্ঠ প্রায় ৪০ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিহত হন। তবে সামরিক সাফল্যের বাইরে সম্ভাব্য নেতৃত্ব পরিবর্তন নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দেখা যায়নি।
হামলার ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প অবশিষ্ট শাসনব্যবস্থাকে অস্ত্র ফেলে দেয়ার হুঁশিয়ারি দেন, অন্যথায় ‘নিশ্চিত মৃত্যু’র মুখোমুখি হওয়ার জন্য তৈরি থাকতে বলেন। ইরানের জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতা তোমাদেরই নিয়ে নিতে হবে।’
ভেনেজুয়েলার মতোই ইরানে খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসনের পছন্দের কিছু নাম থাকলেও, একই হামলায় তাদের বেশিরভাগই নিহত হয়েছেন। ট্রাম্প এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘যাদের আমরা ভাবছিলাম, তারা সবাই মারা গেছে।’ তবু ট্রাম্প শিবির ও সিআইএ মনে করছে, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকে থাকবে। ট্রাম্পের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পরবর্তী নেতা যেন হন ইরানের এক ‘ডেলসি রোদ্রিগেজ’, অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত পুতুল।
একই ধরনের তৎপরতা কিউবাতেও দেখা যাচ্ছে। ভেনেজুয়েলার পর পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী শাসন উৎখাতে কিউবাই ছিল পরবর্তী লক্ষ্য। কার্যত তেল অবরোধ দিয়ে মঞ্চ প্রস্তুত করা হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিও কিউবার সাবেক নেতা রাউল কাস্ত্রোর নাতির সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। ট্রাম্প এটিকে বলছেন ‘বন্ধুত্বপূর্ণ দখল’, যেখানে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ মানে শিরশ্ছেদ বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই নিয়ন্ত্রণ।
ট্রাম্প চাইলে অন্য দেশগুলোর নেতারাও স্বেচ্ছায় যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত হতে পারে—এমন ইঙ্গিত তিনি দিয়েছেন কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোর ঠাট্টা বা ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড নেয়ার প্রসঙ্গে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি তার ‘নব্য-রাজতান্ত্রিক’ বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন, যেখানে সবকিছু তার আনুগত্যের অংশ।
ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রের পুতুল সরকার গঠনের নজির নতুন নয়। ১৯৫৩ সালে ইরানে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে উৎখাত করে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন যে অভ্যুত্থান ঘটায়, তার ফলেই ক্ষমতায় আসেন যুক্তরাষ্ট্রপন্থি শাহ, যার পরিণতি হয় ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। তবে শীতল যুদ্ধের পর থেকে মার্কিন নীতিতে প্রক্সি সরকার বসানোর বদলে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনকে উৎসাহিত করার প্রবণতা ছিল, যদিও ইরাক ও আফগানিস্তানে সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
ওয়াশিংটন সাধারণত প্রকাশ্য পরাধীনতা বা কারও অধীনতা দাবি করাকে স্বৈরশাসকদের কৌশল হিসেবে দেখত। এই তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত নাম ভ্লাদিমির পুতিন, যিনি সোভিয়েত-পরবর্তী অঞ্চলকে নিজের অধিভুক্ত মনে করেন। ইউক্রেনে তার যুদ্ধের সূচনা হয় ২০১৪ সালে, সেসময় জনগণ দেশটির পুতুল নেতা ভিক্টর ইয়ানুকোভিচকে ক্ষমতাচ্যুত করে।
মধ্যপ্রাচ্যে বোমা বিস্ফোরণের মধ্যে ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কে হবে তা বলা এখনই সম্ভব নয়। ভেনেজুয়েলা, কিউবা কিংবা অন্য দেশগুলোর ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত। তবে বিশ্লেষকদের মতে, একসময় অকল্পনীয় ছিল এমন একটি বিষয় এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে এবং অনেকটা প্রায় স্বাভাবিক হয়ে গেছে; আর তা হলো- যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আর ‘মুক্ত বিশ্বের নেতা’ নন, বরং তিনি একজন শক্তিমান ব্যক্তি।
এআরএস

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: