পদ্মা ব্যারাজে বদলে যাবে ২৪ জেলার অর্থনীতি, সুফল পাবে ৭ কোটি মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২১:০৯ পিএম

রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার হাবাসপুরে প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ হলে শুধু রাজবাড়ী নয়, দেশের দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের ২৪ জেলার প্রায় সাত কোটি মানুষ এর সুফল পাবেন বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি।

তার দাবি, এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নদীভাঙন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কৃষি, মৎস্য, নৌযোগাযোগ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। এর ফলে বদলে যাবে এ অঞ্চলের অর্থনীতিও।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার হাবাসপুর কে রাজ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে পানিসম্পদমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

এর আগে বেলা ১১টার দিকে মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এবং রাজবাড়ী-২ আসনের সংসদ সদস্য হারুন-অর-রশিদ হারুনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হাবাসপুরে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের প্রস্তাবিত স্থান পরিদর্শন করেন।

জনসভায় পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, ‘পদ্মা ব্যারাজ শুধু একটি বাঁধ বা অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প নয়- এটি দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। ২৪ জেলার প্রায় সাত কোটি মানুষের জীবন ও অর্থনীতির সঙ্গে এ প্রকল্পের সম্পর্ক রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘পদ্মা ব্যারাজ বাংলাদেশের একটি মাস্টারমাইন্ড মেগা প্রজেক্ট। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ২৪টি জেলার অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটবে। কৃষিতে বিপ্লব হবে, বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, মাছের উৎপাদন বাড়বে। এর সঙ্গে আরও অনেক সুযোগ-সুবিধা যুক্ত হবে।’

পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, ‘হাবাসপুর এলাকায় একসময় পদ্মা নদী অনেক দূরে ছিল। নদীভাঙনে ভাঙতে ভাঙতে এখন নদী মানুষের বসতবাড়ির কাছে চলে এসেছে। বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি ও প্রবল স্রোতে ভাঙন ও প্লাবন দেখা দেয়। আবার শুষ্ক মৌসুমে দেখা দেয় পানির সংকট। বছরের পর বছর এ অঞ্চলের মানুষ কখনও বন্যা, কখনও ভাঙন, আবার কখনও পানির সংকটের সঙ্গে লড়াই করছেন। শুধু রাজবাড়ীর মানুষ নয়, উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৪ জেলার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পানি সংকট ও নদীভাঙনের ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের পাশাপাশি নদী, খাল-বিল ও জলাশয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।’

পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ দীর্ঘদিনের উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশি-বিদেশি পানি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে কারিগরি সমীক্ষা ও সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে। ২০০৪ সাল থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিস্তারিত সমীক্ষার কাজ এগিয়ে নেয়া হয়। ২০০৪ সাল থেকে কারিগরি সমীক্ষা নিয়ে আমরা এগিয়ে এসেছি। আজ ২০২৬ সালে এসে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য একনেকে অনুমোদন পেয়েছে। আমাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন এখন বাস্তবে রূপ দেওয়ার সময় এসেছে।’

সরকার পদ্মা ব্যারাজকে অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে বাস্তবায়ন করছে জানিয়ে তিনি বলেন, আগামী বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি বা মার্চের মধ্যে যেকোনো সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রকল্পটির উদ্বোধন করতে পারেন।

প্রকল্পের আওতায় নেভিগেশন লক, বিভিন্ন ধরনের গেট ও পানি নিয়ন্ত্রণের অবকাঠামো থাকবে বলে জানান মন্ত্রী। প্রয়োজন অনুযায়ী পানি সংরক্ষণ ও সরবরাহের ব্যবস্থাও থাকবে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল ব্যারাজে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডারস্লুইস, দুটি ফিশ পাস, নেভিগেশন লক ও গাইড বাঁধ থাকবে। প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে।

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের সঙ্গে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানান পানিসম্পদমন্ত্রী। সরকারি হিসাবে, প্রকল্পের আওতায় দুটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে মোট প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, কৃষি ও মাছের উৎপাদন বাড়লে এ অঞ্চলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এতে স্থানীয় অর্থনীতির গতি আরও বাড়বে।’

গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে মন্ত্রী বলেন, ‘নতুন চুক্তিতে বাংলাদেশের পানির ন্যায্য হিস্যা ও অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। নতুন চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা চলছে।’

পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্য

দেশজুড়ে খাল খনন ও পুনঃখননের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলেও জানান পানিসম্পদমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্য রয়েছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলে পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, জলাবদ্ধতা কমানো, কৃষিতে সেচ সুবিধা বাড়ানো এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার উদ্যোগ নেয়া হবে।’

পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ হলে নদীভাঙন, বন্যা ও শুষ্ক মৌসুমের পানির সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করা কঠিন। পদ্মার পাড়ের মানুষ বছরের পর বছর প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে আছেন। পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ হলে আপনাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ও দাবি বাস্তবায়নের পথ তৈরি হবে।’

প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা চেয়ে পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, ‘বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় সাময়িকভাবে মানুষের কিছুটা কষ্ট হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল অনেক বেশি হবে। এ কারণে প্রকল্পের কাজে স্থানীয় জনগণকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানাচ্ছি। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জনগণের সহযোগিতায় আগামী দিনে পদ্মা ব্যারাজকে দৃশ্যমান করা হবে। ইনশাল্লাহ, এই প্রকল্পের মধ্য দিয়ে আপনাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।’

উল্লেখ্য, গত ১৩ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ‘পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়। সরকারি হিসাবে প্রথম পর্যায়ের প্রকল্প ব্যয় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময়কাল ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুন পর্যন্ত।

জনসভায় আরও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এবং রাজবাড়ী-২ আসনের সংসদ সদস্য হারুন-অর-রশিদ হারুন। হাবাসপুর ইউনিয়ন বিএনপির আয়োজনে অনুষ্ঠিত জনসভায় সভাপতিত্ব করেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুল মান্নান প্রামাণিক।

LIMON

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর